জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, টানা পাঁচ মাসের ধারাবাহিকতায় জানুয়ারিতেও বিশ্ববাজারে কমেছে খাদ্যপণ্যের দাম। অন্যদিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে দেশে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ডলার বেশি আসছে। চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়ায় দেশের ভোগপণ্য আমদানিতে নেই কোনো সংকট। অনুকূল রয়েছে শীত মৌসুমের আবহাওয়া পরিস্থিতি। এতসব ইতিবাচক দিকের মধ্যেও দেশে মূল্যস্ফীতি না কমে জানুয়ারিতে উল্টো বেড়েছে। পণ্য ও সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার এ ব্যর্থতা নিয়েই চলতি মাসে শেষ হতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে প্রতি মাসে হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সর্বশেষ গতকাল প্রকাশ করা হয়েছে জানুয়ারির তথ্য। এতে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর আগে গত ডিসেম্বর ও নভেম্বরেও তা বেড়েছিল। সে হিসাবে টানা তিন মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ধারায়।
বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী থাকায় দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ার কথা। কিন্তু উল্টো টানা চার মাস ধরে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্যই ছিল সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা।
অর্থনীতিবিদ ও বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভেঙে যাওয়ার সুফল পাওয়ার কথা ছিল জনগণের। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে সেটির বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল না। বরং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই এ সরকারের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব নীতি ও পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েক বছর ধরে সুদহার বাড়িয়ে, সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো কাজে দেয়নি। উল্টো আমরা দেখছি, তিন মাস ধরে এ হার আবারো বাড়ছে। আর মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রেখেই অন্তর্বর্তী সরকার তার মেয়াদ শেষ করতে যাচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি, বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতিসহ আনুষঙ্গিক কারণেই সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। অতীতের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও বাজারের ক্ষমতাশালী মাফিয়া গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এ কারণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপ ইতিবাচক ফল দেয়নি।’
অন্তর্বর্তী সরকার সফল না হলেও বিদায়ী বছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সফল হয়েছে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছর আগেও এ হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল। আর আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার তথ্য বলছে, গত বছর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির গড় হার ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৪ সালে যেখানে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জেপি মরগান রিসার্চের তথ্যেও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ২ শতাংশ কমে আসার কথা জানানো হয়।
গত বছর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিপুল সাফল্য দেখিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে প্রতিবেশী ভারতের মূল্যস্ফীতি দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে আসে। ডিসেম্বরে কিছুটা বাড়লেও এ হার ছিল ১ শতাংশের ঘরে। গত বছরের অর্ধেকের বেশি মাসজুড়ে মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক ধারায় ছিল শ্রীলংকায়। বছরের শেষের দিকে এসে এ হার কিছুটা বাড়লেও ডিসেম্বরে ২ দশমিক ১০ শতাংশ ছিল বলে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলংকা জানিয়েছে। কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তানও ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে।
বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালের পর থেকেই দেশে মূল্যস্ফীতি উসকে উঠতে শুরু করে। ডলার সংকটের কারণে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে। প্রতি ডলার ৮৪ থেকে বেড়ে মাত্র আড়াই বছরে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। অল্প সময়ের ব্যবধানে টাকার প্রায় ৪৫ শতাংশ অবমূল্যায়নের ধাক্কায় দেশের মূল্যস্ফীতিও তীব্র আকার ধারণ করে। তা নিয়ন্ত্রণে ২০২৩ সাল থেকে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান তথা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। কিন্তু সংকোচনমুখী মুদ্রানীতিতেও মূল্যস্ফীতি তেমন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার রেকর্ড ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠে যায়। পরে তা কমতে কমতে গত অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা ৩৯ মাসের মধ্যে ছিল সবচেয়ে কম। তবে নভেম্বরে এসে মূল্যস্ফীতি আবারো বাড়তে শুরু করে। নভেম্বরে এ হার বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে উন্নীত হয়। ডিসেম্বরে আরো বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়ায়। আর চলতি বছরের জানুয়ারিতে এসে মূল্যস্ফীতির ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এমন এক সময়ে তা বাড়ছে, যখন দেশের ডলার সংকট অনেকটাই কেটে গেছে, ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) উদ্বৃত্তের ধারায় ফিরেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে এবং বিনিময় হারেও স্থিতিশীলতা এসেছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদায়ী বছরের মতো জানুয়ারিতেও দেশে সবজির বাজার বেশ চড়া ছিল। বিশেষ করে শীত মৌসুম শুরুর পরও গত নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সবজির দাম খুব বেশি কমেনি। ডিসেম্বরের শেষের দিকে কৃষকপর্যায়ে সবজির দামে বড় পতন হলেও তার সুফল ক্রেতাপর্যায়ে পৌঁছেনি। আবার গত বছর চাল, ডাল, চিনি, আটা, মাছ-মাংস, এলপিজি গ্যাসসহ বেশির ভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বা জিডিপির ক্ষেত্রে আমরা শুধু তথ্য সংগ্রহ করি এবং সে তথ্য অনুসারে প্রতিবেদন প্রকাশ করি। বিশ্লেষণ করা আমাদের কাজ নয়। সেটি নীতিনির্ধারকরা করেন। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে দেশের ১৫৪টি বাজারের তথ্য নেয়া হয়।’
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মাত্র দুইদিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর মাধ্যমে গঠিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্বকালীন ১৮ মাসের মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ সরকার দায়িত্ব নেয়ার মাসে অর্থাৎ ২০২৪-এর আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ওই বছরের নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে। ২০২৪ সালের সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ। ২০২৫ সালে এসে অবশ্য তা কমতে শুরু করে। গত বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৯৪ এবং ডিসেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গত বছর সবচেয়ে কম মূল্যস্ফীতির হার ছিল অক্টোবরে (৮ দশমিক ১৭ শতাংশ) ও গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি নিয়ে চেষ্টা করেছে। নীতি সুদহার ১০ শতাংশ এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৪-১৫ শতাংশ করা হলেও সেটি কাজে আসেনি। এতে বোঝা যাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আইএমএফের প্রেসক্রিপশন কাজ করেনি। অন্তর্বর্তী সরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।’
নির্বাচিত সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিকল্প কৌশল খুঁজতে হবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে যে দল ক্ষমতায় আসবে, তাদের মূল্যস্ফীতি নাগালে রাখার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ কৌশলের বিকল্প ভাবতে হবে। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়ানো, আমদানি ও উৎপাদিত পণ্য স্টক থেকে যথাসময়ে ছাড়া—এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে। বাজারে সরকারের নজরদারি ও খবরদারি বাড়াতে হবে। প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যেন আমদানি ও উৎপাদিত পণ্য ভোক্তা স্তরে পৌঁছায়। বাজারে সিন্ডিকেট থাকতে পারবে না।’